নতুন বিষয় নতুন সম্ভাবনা : এন্ট্রাপ্রেনারশিপ

নতুন বিষয় নতুন সম্ভাবনা : এন্ট্রাপ্রেনারশিপ

  • মারুফ ইসলাম

অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই, প্রতি বছর যে পরিমাণ তরুণ-তরুণী পড়াশোনা শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হয় সে পরিমাণ কর্মসংস্থানের সুযোগ নেই বাংলাদেশে। ফলে দেশে বাড়ছে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা। আর বিপরীতে কমছে কর্মসংস্থানের পরিধি। কারণ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা। তাই বলে কি বসে থাকবেন তরুণরা? মোটেও না। তারা নিজেরাই খুঁজে নিচ্ছেন উদ্যোক্তা হওয়ার পথ।

কিন্তু এ পথ যে বড় বন্ধুর। পদে পদে আছে বাধা। কীভাবে মোকাবেলা করবেন সেসব বাধা। কীভাবেই বা পাড়ি দেবেন বিপদসংকুল সে পথ? কোনো দিক নির্দেশনা নেই। নেই বলার মতো কোনো প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান। ফলে একধরনের দিশেহারা অবস্থার মধ্যদিয়েই সামনে এগিয়ে যাচ্ছিলেন তরুণ উদ্যোক্তারা।

তরুণদের এই সমস্যা উপলব্ধি করে দেশে প্রথমবারের মতো ‘এন্ট্রাপ্রেনারশিপ’ নামে চার বছর মেয়াদী স্নাতক কোর্স চালু করে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি।

পড়ার নতুন বিষয়

‘কলেজে পড়ার সময়ই সিদ্ধান্ত নিই, ভবিষ্যতে উদ্যোক্তা হব। তাই এইচএসসি পাস করার পর খোঁজ নিতে থাকি কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্যোক্তা বিষয়ে পড়ানো হয়। অবশেষে জানলাম, একমাত্র ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়েই এ বিষয়ে পড়ার সুযোগ আছে। তাই কালবিলম্ব না করে ভর্তি হয়ে যাই।’ এক নাগাড়ে কথাগুলো বলে গেলেন আতিকুর রহমান। তিনি এন্ট্রাপ্রেনারশিপ বিভাগের তৃতীয় ব্যাচের শিক্ষার্থী। তবে আশিকুর রহমান চৌধুরীর অবশ্য এ রকম কোনো ‘টার্গেট’ ছিল না। তিনি অনেকটা দৈবচক্রেই উদ্যোক্তা বিষয়ে পড়ছেন। তারপর পড়তে এসে দেখলেন পুরো কোর্স পড়তে হবে ইংরেজি মাধ্যমে; বাংলার কোনো সুযোগ নেই। একটু ঘাবড়ে গেলেন আশিক, পারবেন তো? তারপর কদিন বাদেই টের পেলেন কোথায় ভয়, কোথায় ডর? সবকিছুই ‘জলবৎ তরলং’।

img_4016
আগামীর দিন তো উদ্যোক্তাদের দিন

কীভাবে সম্ভব হলো? জিজ্ঞেস করি।‘কারণ আমাদের শিক্ষক-শিক্ষিকারা ক্লাসে প্রতিটি বিষয় অত্যন্ত সহজভাবে বুঝিয়ে দেন এবং আমাদের যেকোনো প্রয়োজনে পূর্ণ সহযোগিতা দিয়ে থাকেন।’ বলছিলেন আশিক।

এরপর কথা হয় চতুর্থ ব্যাচের নওরীন নুশরাত নিশিতার সঙ্গে।‘প্রথমে একটু দুশ্চিন্তায় ছিলাম। ভেবেছিলাম নতুন ডিপার্টমেন্ট, অনেক সমস্যা আছে হয়তো। শিক্ষক স্বল্পতা কিংবা সেমিনার-লাইব্রেরি আছে কি না, থাকলেও পর্যাপ্ত বই নেই হয়তো…। কিন্তু ক্লাস করতে এসে দেখলাম, কোনো সমস্যা নেই। শিক্ষকেরা অনেক আন্তরিক ও সহযোগিতাপরায়ণ। বিশেষ করে আমাদের বিভাগীয় প্রধান সৈয়দ মারুফ রেজা স্যার। তিনি আমাদের সার্বক্ষণিক খোঁজখবর রাখেন।’

কথা বলি দ্বিতীয় ব্যাচের ইকবাল হোসেন শিমুল ও অন্তরার সঙ্গে। তাঁরা দুজনেই জানালেন, তাঁদের কোনো সেশনজট নেই। ক্লাস-পরীক্ষা সব নিয়মিতই হচ্ছে।

এই দুজনের কথার ফাঁকে আড্ডায় যোগ দেন তৃতীয় ব্যাচের তন্বী। ‘আগামীর দিন তো উদ্যোক্তাদের দিন। আমি তাই পড়াশোনার বিষয় হিসেবে বেছে নিয়েছি এন্ট্রাপ্রেনারশিপকে। কে না জানে, ভবিষ্যতের ভাবনা ভাবাই জ্ঞানীর কাজ।’ হাসতে হাসতে বলছিলেন তন্বী।

জিজ্ঞেস করি নতুন ডিপার্টমেন্ট হিসেবে কোনো সমস্যা আছে কি না। এবার তন্বীকে থামিয়ে জোহাদুর রহিম বলতে শুরু করেন, ‘একটু-আধটু সমস্যা তো থাকবেই, যেহেতু নতুন ডিপার্টমেন্ট। তবে সেগুলো মেজর প্রবলেম নয়। আমাদের শিক্ষকেরা অনেক ভালো, অনেক দক্ষ। তাঁদের সহযোগিতায় ডিপার্টমেন্টে নিয়মিত সেমিনার, ওয়ার্কশপ ও ফেস্টিভ্যাল হয়। ফলে আমরা হাতে কলমে শিক্ষা পাচ্ছি।’

dscf1418
হাতেকলমে পাঠ নিতে শিক্ষাসফরে শিক্ষার্থীরা

কেন উদ্যোক্তা বিভাগ

‘আমরা এমন এক সময়ে বসবাস করছি যখন সারা বিশ্বে রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে। এই পরিবর্তন আমাদের সামনে হাজির করেছে নানা ধরনের সুযোগ। যিনি চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে সক্ষম তিনিই এইসব সুযোগের সদ্বব্যবহার করতে পারবেন।’ এমনটাই মনে করেন এন্ট্রাপ্রেনারশিপ বিভাগের সহকারী সমন্বয়ক সুলতান মাহমুদ সুজন। তিনি জানান, বিগত চল্লিশ বছরে আমরা বিশ্বজুড়ে বেশ কয়েকজন শক্তিশালী উদ্যোক্তার উত্থান দেখেছি। উদ্যোক্তারা সারা বিশ্বের ব্যবসার প্রচলিত ধারনাকেই পাল্টে দিয়েছে। বাংলাদেশও এর ব্যাতিক্রম নয়।

সুলতান মাহমুদ সুজন বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ কঠোর পরিশ্রমী, ত্যাগী এবং প্রচণ্ড মেধার অধিকারী। এদেশর তরুণ উদ্যোক্তাদের হাত ধরেই এগিয়ে যাচ্ছে অর্থনীতি।’

এসব দিক বিবেচনা করে দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও এন্ট্রাপ্রেনারশিপ ডিপার্টমেন্ট খোলা উচিত বলে মনে করেন সুলতান মাহমুদ সুজন।

বিভাগীয় প্রধানের বক্তব্য

বিভাগীয় প্রধান সৈয়দ মারুফ রেজা
বিভাগীয় প্রধান সৈয়দ মারুফ রেজা

এন্ট্রাপ্রেনারশিপ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান সৈয়দ মারুফ রেজা শুরুতেই একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরেন। ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্যমতে, শুধু গত বছরেই বাংলাদেশে এক লাখ ২৬ হাজার  ৫১৪ জন উদ্যোক্তা সৃষ্টি হয়েছে।’ তারপর হেসে বলেন, ‘বুঝতেই পারছেন, দেশে কী পরিমাণ উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে। এদেরকে উদ্যোক্তা বিষয়ে যথাযথ শিক্ষা দিতে পারলে দক্ষ মানব সম্পদে পরিণত হতে পারত। তাই ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি এন্ট্রাপ্রেনারশিপ বিভাগ চালু করেছে।’

সৈয়দ মারুফ রেজা আরও বলেন, ‘ডিগ্রি নেওয়ার পর শিক্ষার্থীরা যেন সহজেই দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত হয় এবং চাকরি খোঁজার পরিবর্তে নিজেরা স্বাবলম্বী হয় সে উদ্দ্যেশেই এ বিভাগ খোলা হয়েছে।’ বাংলাদেশকে আগামী ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করার লক্ষ্যে এ কোর্স চালু করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

কেন ভর্তি হবে শিক্ষার্থীরা

প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এই বিভাগ শিক্ষার্থীদের বিশ্বমানের শিক্ষাসুবিধা প্রদানের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কফম্যান ফাউন্ডেশন, ফোর্ট হায়েস স্টেট ইউনিভার্সিটি, সিরডাপ, জাপানের জেট্রো, ভারতের আইএমএসএমই ইন্ডিয়া, নেপালের গ্লোকাল লিমিটেডসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করেছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) এসআইওয়াইবি কর্মসূচী, চাইল্ড অ্যান্ড ইয়ুথ ফাইন্যান্স ইন্টারন্যাশনালের গ্লোবাল মানি উইক, কফম্যান ফাউন্ডেশনের গেট ইন দ্য রিং ও গ্লোবাল ইয়াং অন্টারপ্রিনিউরশীপ সামিট, এবং মালয়েশিয়ার পারলিস ইউনিভার্সিটির গ্লোবাল এন্ট্রাপ্রেনারশিপ সামার ক্যাম্পসহ দেশি-বিদেশী বিভিন্ন আয়োজনের সাথে নিজেদের যুক্ত করেছে।

সৈয়দ মারুফ রেজা বলেন, ‘আমরা জানি শুধু বই পড়ে কেউ কখনো উদ্যোক্তা হতে পারে না। তাই বই পড়ার পাশাপাশি বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য নিয়মিত স্টার্টআপ মার্কেট ও স্টার্টআপ এক্সপো আয়োজন, শিল্প-কারখানা পরিদর্শন, নিজস্ব ইনকিউবেশন সেন্টারের সহায়তায় সৃজনশীল ব্যবসায়ী ধারণা উদ্ভাবনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বিশ্বমানের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার প্রচেষ্টা নেয়া হয়েছে। আমরা মনে করি দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে এই বিভাগের শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে উল্লেখযোগ্য ভুমিকা রাখতে সক্ষম হবে।’favicon59

Sharing is caring!

2 Comments on this Post

  1. where is 1st batch?

    Reply
  2. Where is other students in this department?

    Reply

Leave a Comment