দাঁত নিয়ে ভাবনা

দাঁত নিয়ে ভাবনা

শিমি আক্তার : ‘দাঁত থাকতে দাঁতের যত্ন নিন’ অনেক সময়ই আমরা উপদেশমূলক অর্থে এই কথাটি ব্যবহার করে থাকি। আসলেও তাই, এটা শুধু আর উপদেশমূলক কথাতেই সিমাবদ্ধ নেই। বাস্তবেও আমাদের সুস্থ থাকার জন্য দাঁতের যত্ন নিতে হবে। তাই চলুন দেখে নেই দাঁতের কিছু সমস্যার কথা।


shutterstock_44483749দাঁতের সমস্যা

  • দাঁতের সমস্যার কারণে মুখে দুর্গন্ধ, দাঁতের ক্ষয়, মাড়ি ক্ষয়, দাঁতের গোড়ায় গর্ত হওয়া, মুখের ক্যান্সার, মুখের ব্যথা, দাঁতের ব্যথা, দাঁতের সংবেদনশীলতা, মাড়ি ফোলা, দাঁতের রং নষ্ট হওয়া, পেরিওডেন্টাইটিস ইত্যাদি হতে পারে। পেরিওডেন্টাইটিস রোগ দীর্ঘস্থায়ী হলে দাঁতের পার্শ্ববতী চোয়ালের হাড়ের ক্ষয় হয় এবং সে ক্ষেত্রে দাঁত নড়ে যায় । এ রোগে মুখে দূর্গন্ধ হয়, মাড়ি ফোলা, মাড়ি থেকে পুঁজ পড়া ও রক্ত বের হতে পারে।

 

দাঁত ব্যথার কারণ

  • দাঁতের স্নায়ু আক্রান্ত হলে দাঁতে ব্যথা হতে পারে। এক্ষেত্রে ধরে নেওয়া হয় এর পাল্প চেম্বারে ইনফেকশন হয়েছে। দাঁতের ডেন্টিন স্তরের পরেই থাকে পাল্প চেম্বার, এই পাল্প চেম্বারে সূক্ষ্ম রক্তবাহী স্নায়ু থাকে। দাঁতের ক্ষয়রোগের ফলে এনামেল ও ডেন্টিন স্তর ক্ষতিগ্রস্থ হয়। ফলে পাল্প চেম্বারের রক্তবাহী স্নায়ু আক্রান্ত হয়। দাঁতের গঠনাকৃতির কারণেও দাঁত ব্যথা হয়ে থাকে।

 

দাঁতের চিকিৎসা

  • আমারা অনেকেই দাঁতের সমস্যা হলেও তার গুরুত্ব কম দেই। দাঁত আমাদের শরীরের অন্যান্য অঙ্গ প্রত্যঙ্গের একটি তাই দাঁতের সমস্যা হলে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চিকিৎসা করা প্রয়োজন। দাঁত ব্যথা হলেই দাঁতকে তুলে ফেলতে হবে এমন একটা ধারণা আমাদের মধ্যে রয়েছে। বর্তমান আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের যুগে দাঁত তুলে ফেলা কোনো সঠিক সমাধান নয়। দাঁত তুলে ফেললে শরীরে নানা সমস্যা দেখা দেয়। দাঁতের বিভিন্ন রকমের চিকিৎসা রয়েছে যার ফলে রোগাক্রান্ত দাঁতকে অনেক দিন সুস্থ ও সবল রাখা যায়।

 

দাঁত জীবানুমুক্ত করণ

  • বর্তমান যুগে দাঁত উঠানোর পরিবর্তে দাঁতের সংরক্ষণ নিয়ে অনেক গবেষণা হচ্ছে। ইনফেকশন নিয়ে কোনো দাঁত উঠানো উচিত নয়। এখন আধুনিক সূক্ষ্ম যন্ত্রাংশের সাহায্যে দাঁতের জীবাণুমুক্তকরণ করে দাঁতের পাল্প চেম্বারের ইনফেকশন দুর করা হয়। এ পদ্ধিতিতে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রস্তুত কিছু পদার্থ পাল্প চেম্বারে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় ।

 

রুট ক্যানেল ক্রাউন ক্যাপ চিকিৎসা

  • রুট ক্যানেল একটি উন্নত চিকিৎসা পদ্ধতি। সাধারণত দাঁত বেশি গভীরে গেলে রুট ক্যানেল চিকিৎসা করা হয়। এই অবস্থায় আধুনিক রুট ক্যানেল চিকিৎসায় দাঁতকে বাঁচানো সম্ভব। এ পদ্ধতিতে ওষুধ প্রয়োগের মাধ্যমে অসুস্থ দাঁতকে ব্যথাহীন ও কার‌্যকর করা যায়। এরপর রুট ক্যানেল করা হয় । তারপর এই দাঁতকে মজবুত করার জন্য মুকুটের ন্যায় অবিকল দাঁতের রঙয়ের এবং প্রায় আসল দাঁতের মতোই দেখতে একটি বস্তু বসিয়ে দেওয়া হয় । এর নাম ক্রাউন। রুট ক্যানেলের পরে একটি মুকুট বা ক্রাউন পরিয়ে দিলেই দাঁত আবার পূর্বাবস্থায় ফিবে আসে। বিভিন্ন ধাতু দিয়ে এই ক্রাউন তৈরি করা যায়। ধাতু ভেদে এটির তৈরি খরচ আলাদা হয়ে থাকে। এই দাঁত দিয়ে স্বভাবিক খাবার খাওয়া যায় । কোনো দূর্ঘটনার ফলে বা অন্যান্য কারণে দাঁত ভেঙ্গে গেলেও এই চিকিৎসা পদ্ধতি কাজে লাগানো যেতে পারে।

 

আলট্রাসোনিক স্কেলিং

  • আলট্রাসোনিক স্কেলিংয়ের সাহায্যে দাঁতের ময়লা বা ডেন্টাল প্লাক পরিস্কার করা হয়। প্রথমে মুখের ইনফেকশন কমিয়ে তারপর মাড়ির চিকিৎসা করা হয়। এ ক্ষেত্রে প্রথমে এক্স-রে করে ঝুঝতে হয় কী ধরনের হাড় ক্ষয় হয়েছে। মাড়ির বিভিন্ন ধরনের চিকৎসা পদ্ধতিতে নড়ে যাওয়া দাঁতকে আবার সঠিকভাবে রাখা যায়। আলট্রাসোনিক স্কেলিং চিকিৎসা এখন আমাদের দেশেও হচ্ছে। মাড়ির এই অপারেশনটি সারাতে সময় লাগে প্রায় সাত দিনের মতো। আলট্রাসোনিক স্কেলিংয়ের মাধ্যমে সর্বপ্রথম মুখের ইনফেকশন ও দুর্গন্ধ দুর করে তবেই এ মাড়ির শল্যচিকিৎসা করা হয়। তাই দাঁত নড়ে গেলে বা অতিরিক্ত ক্ষয় অথবা গর্ত হলেও না তুলে ওই দাঁতের সংরক্ষণ করা সম্ভব ।

 

দাঁতের সমস্যায় হৃদরোগ

  • হৃদরোগ আমাদের জন্য একটি আতঙ্কের নাম। এই রোগ থেকে দূরে থাকার জন্য আমরা অনেক ধরণের কষ্টসাধ্য কাজ করে থাকি। কিন্তু আমরা অনেকেই জানি না যে, দাঁতের সমস্যা থেকেও হৃদরোগ হতে পারে। একবার হৃদরোগ হয়ে গেলে তার জন্য বিভিন্ন প্রকার চিকিৎসার খরচ বাবদ কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত লাগতে পারে। এ জন্য আমাদের আগে থেকে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। দাঁতের চিকিৎসকদের কাছ থেকে সঠিক সময়ে পরামর্শ নেওয়ার ফলে বিশ্বের উন্নত দেশে হার্টসংক্রান্ত চিকিৎসার খরচ অনেকটাই কমিয়ে ফেলতে সক্ষম হয়েছে। হার্টের সুস্থতার জন্য বিশ্বমানের প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে দাঁতকে সুরক্ষা করার জন্য আমাদের সবাই সচেষ্ট হতে হবে। একটি অসুস্থ দাঁতকে উন্নত টেকনোলজির মাধ্যমে সুস্থ করতে যে খরচ হয় তা ওই হৃদযন্ত্রের চিকিৎসার ব্যয়বহুল খরচের তুলনায় বহুগুণ কম।

 

লক্ষ্যণীয়

  • ধূমপাণের কারণে দাঁতের মাড়ির রোগ হয়। ধূমপাণকারীর দাঁতের চিকাৎসায় সফলতা ও অনেক কঠিন হয়ে থাকে। তাই ধূমপাণ বর্জন করা উচিত।
  • মেয়েদের হরমোনাল পরিবর্তনের কারণে দাঁতের সেনসিটিভ ও মাড়ি ফোলা দেখা দিতে পারে।
  • ডায়াবেটিস রোগীদের দাঁতের মাড়ির রোগ ও ইনফেকশনের উচ্চ ঝুঁকি থাকে।
  • দাঁতের সমস্যায় এইডস রোগীদের চিকিৎসা জটিল হয়ে যায় ও ক্যান্সারের সম্ভাবনা থেকে যায়।
  • বংশগত বা জেনেটিক ভাবেও দাঁতের রোগের ঝুঁকি থাকে।

ডেনটিস্ট্রি ডটকম অবলম্বনে।favicon59

Sharing is caring!

Leave a Comment