ঊনিশে উত্থান মাইকেল ডেলের

ঊনিশে উত্থান মাইকেল ডেলের

জনপ্রিয় ম্যাগাজিন ফোর্বসের তালিকায় শীর্ষ ধনীদের মধ্যে ১০ নম্বর অবস্থানে আছেন মাইকেল ডেল। তিনি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘ডেল’র চেয়ারম্যান এবং সিইও। তাঁর সম্পদের পরিমাণ ১৯ দশমিক ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। পঞ্চাশ বছর বয়সী ডেলের উত্থানের গল্প শোনাচ্ছেন মারুফ ইসলাম


12465506_1124034200964564_740033324_o

বয়স ঊনিশ, পকেটে ১ হাজার ডলার

প্রযুক্তি সম্পর্কে যারা টুকটাক খোঁজ খবর রাখেন তাদের কাছে ‘ডেল’কে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কিছু নেই। ডেল এখন বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম কম্পিউটার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান। কিন্তু আপনি কী জানেন, কত টাকা নিয়ে ব্যবসা শুরু করেছিলেন মাইকেল ডেল? মাত্র এক হাজার ডলার নিয়ে। ডেল তখন টেক্সাস ইউনিভার্সিটিতে জীববিজ্ঞান বিষয়ের শিক্ষার্থী। থাকতেন বিশ্ববিদ্যালয়েরে এক হলের রুমে। ক্লাসে যাওয়া আসা করতেন নিয়ম মাফিক, কিন্তু পড়ালেখায় মন ছিল না মোটেও। নিজেই কিছু করতে হবে… নিজেই কিছু করতে হবে – এমন এক তাড়না সারাক্ষণ তাঁর মাথার ভেতর ঘুন পোকার মতো কামড়াত। অবশেষে এলো ঘুনপোকা তাড়ানোর সেই কাঙ্ক্ষিত দিন; সময়টা এখনও মনে করতে পারেন ডেল-১৯৮৪ সালের ৪ মে । ওই দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের হলঘর থেকেই শুরু ‘ডেল’ প্রতিষ্ঠার অভিযাত্রা। তখন ডেলের বয়স কত জানেন? উনিশ বছর।

মোর নাম ‘ডেল’ বলে খ্যাত হোক!

শুরুতে প্রতিষ্ঠানটির নাম অবশ্য ‘ডেল’ ছিল না। নাম ছিল ‘পিসি লিমিটেড’। গ্রাহকদের কাছে কম্পিউটারের খুচরা যন্ত্রাংশ বিক্রি করাই ছিল এ প্রতিষ্ঠানের কাজ। এক সময় তাঁর মনে হলো, নিজের নামে প্রতিষ্ঠান হলে দোষ কোথায়? তিনি পিসি লিমিটেডের নাম পাল্টে এর নাম রাখলেন ‘ডেল কম্পিউটার করপোরেশন’।

ছড়িয়ে দেই ডানা

সময় গড়ায় দ্রুত আর ডেলের ব্যবসা গড়ায় ধীরে। এই বৈপরীত্য আর কাঁহাতক ভালো লাগে! ডেল তাই নতুন নতুন পরিকল্পনা আঁটেন। কঠিন-কঠোর পরিশ্রম করেন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে। অতঃপর বছর ছয়েক পর ক্যালেন্ডারে আসে ১৯৯০ সাল। এ বছর থেকেই সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে ছুটতে থাকে ডেলের ব্যবসা। আয়ের বহর বাড়তে থাকে হুহু করে। ডেল সিদ্ধান্ত নেন ব্যবসাকে আরও ছড়িয়ে দেবেন। এই ভাবনা থেকে ১৯৯৬ সালে ডেল নিয়ে আসে প্রথম সার্ভার। সে সময় প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিদিন ১০ লাখ ডলার লভ্যাংশ পেতে থাকেন তিনি। ব্যপারটা মন্দ না, আর একটু ছড়িয়ে দেওয়া যাক ব্যবসাকে! মনে মনে ভাবেন ডেল। তারপর পিসি তৈরিতে মনোযোগ দেন তিনি। সময়টা ২০০১ সাল। ওই বছর প্রথম প্রান্তিকে ডেল আরেক প্রযুক্তিপণ্য নির্মাতা প্রতিষ্ঠান কমপ্যাককে পেছনে ফেলে বিশ্বের সবচেয়ে বড় পিসি তৈরির প্রতিষ্ঠান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

সেই ছোট্ট বয়সেই খণ্ডকালীন চাকরি করে টাকা জমাতেন আর নানা রকম ইলেক্ট্রনিক্সের যন্ত্রাংশ কিনতেন। বয়স যখন ১৫ তখন নিজের জমানো টাকায় একটি অ্যাপলের কম্পিউটার কেনেন। তারপর ঘরে ফিরেই ডেল কী করেছেন জানেন? কম্পিউটারের সব যন্ত্রাংশ খুলে ফেলেছিলেন। তা দেখে ‘হায়! হায়! করছ কী?’ জিজ্ঞেস করেছিলেন ডেলের মা। প্রত্যুত্তরে ‘ওমা! দেখতে হবে না, কীভাবে তৈরি হয়েছে কম্পিউটারটা?’ বলেছিলেন ডেল।

অত:পর শীর্ষ ধনী

২০১২ সালের ফোর্বস ম্যাগাজিনের ধনী ব্যাক্তিদের তালিকায় প্রথম নাম ওঠে মাইকেল ডেলের। তখন তাঁর অবস্থান ছিল ৪১ তম। সম্পদ ছিল ১৬ বিলিয়ন ডলার। আর ফোর্বসের সর্বশেষ (মার্চ ২০১৫) ধনী ব্যাক্তিদের তালিকায় তিনি উঠে আসেন ১০ নম্বরে। এখন তাঁর সম্পদের পরিমাণ ১৯ দশমিক ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

আছে আরও পরিচয়

১৯৯৯ সালে মাইকেল ডেল ও তাঁর স্ত্রী সুজান লিন লাইবারম্যান মিলে প্রতিষ্ঠা করেছেন মাইকেল অ্যান্ড সুজান ডেল ফাউন্ডেশন। এটি মূলত গ্রামের শিক্ষাব্যবস্থা, শিশুস্বাস্থ্য ও পারিবারিক অর্থনীতির ওপর কাজ করে। ফাউন্ডেশনটি এ পর্যন্ত প্রায় ৬৫ মিলিয়ন ডলার অনুদান দিয়েছে। এছাড়া ডেলের আর একটি পরিচয় হচ্ছে, তিনি লেখক। তাঁর জীবনের নানা সময়ের ঘটনা নিয়ে ১৯৯৯ সালে ক্যাথরিন ফ্রিডম্যানের সঙ্গে মিলিতভাবে লেখেন ডাইরেক্ট ফ্রম ডেল : স্ট্র্যাটেজিস দ্যাট রেভল্যুশনাইজড অ্যান ইন্ডাস্ট্রি বইটি। ২০০২ সালে তিনি ইউনিভার্সিটি অফ লিমেরিক থেকে সম্মানিত ডক্টরেট উপাধি লাভ করেন। ওয়ার্থ ম্যাগাজিন তাকে সেরা মার্কিন সিইও হিসেবে ঘোষণা দেয়। অপরদিকে ইঙ্ক ম্যাগাজিন তাকে সেরা উদ্যোক্তা হিসেবে ভূষিত করেছে। এছাড়া ২০১৩ সালে ফ্র্যাঙ্কলিন ইন্সটিটিউট ডেলকে বিজনেস লিডারশিপ পুরস্কার দেয়।

শোনো ও তরুণ প্রাণ…

একজন ভালো বক্তা হিসেবেও সুখ্যাতি রয়েছে মাইকেল ডেলের। তিনি মূলত তরুণদের উদ্দেশ্যে বক্তৃতা দিতে পছন্দ করেন। যুক্তরাষ্ট্রের এক বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবর্তন বক্তৃতা দিতে গিয়ে তিনি তরুণদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘পথচলার সময় অবশ্যই মনে রাখবে, তুমি কোত্থেকে এসেছ। নিজেকে প্রশ্ন করবে, ‘‘আমি কেন এই পথে?’’ এর একটা উত্তর আমি তোমাদের বলতে পারি। সেটা হলো, জিততে। এই জেতাটা হচ্ছে নিজের সম্ভাবনাময় শক্তির জয়। এই জেতাটা হলো শ্রেষ্ঠ হিসাবরক্ষক, প্রকৌশলী অথবা শিক্ষক হওয়ার যে সম্ভাবনা তোমার মধ্যে আছে, সেটার জন্য নিজেকে বিশ্বাস করা। অন্য কারও সাফল্য দেখে নিজের সফলতাকে বিচার করো না।

আমি খুব সৌভাগ্যবান যে আমি আমার আকাঙ্ক্ষা, ইচ্ছে সম্পর্কে সন্দেহাতীত ছিলাম জীবনের শুরু থেকেই। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে জীববিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেছিলাম। কিন্তু কম্পিউটারের সব বইপত্র, যন্ত্রপাতি আমাকে খুব টানত। আমার বয়স যখন ঊনিশ তখন আমি ডেল নিয়ে কাজ শুরু করি, হলের এটি ঘরে।
স্বপ্ন সত্যি করতে তোমার ভেতরে যে ‘তুমি’ আছে, তার কথা শুনতে হবে। আকাঙ্ক্ষা যদি বড় হয়, তোমার স্বপ্ন সত্য হবেই। সততা, নৈতিকতা ও আগ্রহ নিয়ে কাজ করতে হবে। যদি তোমার স্বপ্নের সঙ্গে আপস না করো, তুমি সফল হবেই।’

michael-dellপিছন ফিরে দেখি

আচ্ছা, ডেল কী মাঝে মাঝে পিছন ফেরে দেখেন তাঁর ফেলে আসা শৈশব-কৈশোরকে? মন কী উচাটন হয় তার জন্মভিটা আর পরিবার পরিজনের জন্য? আমরা যারা সাধারণ মানুষ, বিত্তশালীদের দেখলে তাদের মনে ঠিকই উদয় হয় এসব প্রশ্ন। খুব শুনতে ইচ্ছে করে বড়লোকদের বেড়ে ওঠার গল্প। চলুন পূরণ করা যাক সেই ইচ্ছের কিছুটা।

১৯৬৫ সালের, ২৩ ফেব্রুয়ারি টেক্সাসের হিউস্টনে জন্মগ্রহণ করেন মাইকেল ডেল। তার পিতার নাম অ্যালেক্সেন্ডার ডেল এবং মায়ের নাম লরেন চার্লোট ডেল। তাঁর বাবা মা চাইতেন ছেলে ডাক্তার হোক। কিন্তু পড়াশোনায় ছিল না তাঁর মোটে আগ্রহ। সমস্ত আগ্রহ তার যন্ত্রপাতির দিকে। সেই ছোট্ট বয়সেই খণ্ডকালীন চাকরি করে টাকা জমাতেন আর নানা রকম ইলেক্ট্রনিক্সের যন্ত্রাংশ কিনতেন। বয়স যখন ১৫ তখন নিজের জমানো টাকায় একটি অ্যাপলের কম্পিউটার কেনেন। তারপর ঘরে ফিরেই ডেল কী করেছেন জানেন? কম্পিউটারের সব যন্ত্রাংশ খুলে ফেলেছিলেন। তা দেখে ‘হায়! হায়! করছ কী?’ জিজ্ঞেস করেছিলেন ডেলের মা। প্রত্যুত্তরে ‘ওমা! দেখতে হবে না, কীভাবে তৈরি হয়েছে কম্পিউটারটা?’ বলেছিলেন ডেল। ডেল ১৯৮৯ সালে সুসান লীন লিবারম্যানকে বিয়ে করেন। এই দম্পতির ঘরে রয়েছে চারটি সন্তান।

তথ্যঋণ : উইকিপিডিয়া, ফোর্বস, ইঙ্ক ম্যাগাজিন এবং ডেলের ইজস্ব ওয়েবসাইট। favicon5

Sharing is caring!

Leave a Comment