বহুমূখী বৈচিত্র্যময় ক্রিস্টিন লেগার্ডে

বহুমূখী বৈচিত্র্যময় ক্রিস্টিন লেগার্ডে

নীলিমা হক রুমা : আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ সম্পর্কে জানে না এমন মানুষ খুব কমই পাওয়া যাবে। কিন্তু আইএমএফ এর বর্তমান নির্বাহী প্রধান সম্পর্কে আমরা ক’জনই বা জানি! কেউ কেউ হয়তো শুধুমাত্র নামটি জানি কিন্তু সেই ব্যাক্তির অতীত অর্জন, বর্তমান অগ্রগতি এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা সম্পর্কে আমাদের অনেকেরই অজানাই রয়ে গেছে। তবে আর অজানায় না থেকে তাঁর সম্পর্কে জেনে নিই আজ। প্রমিনেন্ট নারী ফিচারের আজকের আয়োজন তাঁকে নিয়েই।


আইএমএফ এর প্রথম নারী ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টিন লেগার্ডে। ছবি : সংগৃহীত।
আইএমএফ এর প্রথম নারী ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টিন লেগার্ডে। ছবি : সংগৃহীত।

তিনি হচ্ছেন ক্রিস্টিন লেগার্ডে যিনি ২০১১ সালের ৫ জুলাই থেকে আইএমএফ এর প্রথম নারী ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নিযুক্ত আছেন। তাঁর ক্যারিয়ার বহুমূখী এবং খুব বৈচিত্র্যময়। ভিন্ন ভিন্ন পদে তিনি নিজ যোগ্যতার প্রমাণ রেখেছেন সবসময়। তাঁর ক্যারিয়ার জীবনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে , তিনি সরকারী রাজনৈতিক ফোরাম জি-৮ এর প্রথম মহিলা অর্থমন্ত্রী ছিলেন। একসময় তিনি ফরাসী সরকারের অর্থ ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের একমাত্র নারী ছিলেন যিনি অর্থনৈতিক পলিসিতে ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আইএমএফ-এ যোগদানের পূর্বে ডমিনিক দে ভিলেপিন সরকারের কৃষি ও মৎস্য মন্ত্রণালয় এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী পদে নিযুক্ত ছিলেন। সেই সাথে লেগার্ডে একজন ফরাসী আইনজীবী ও রাজনীতিবিদ। ১৯৮১ সালে শিকাগো ভিত্তিক আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠানে যোগদান করেন এবং ১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠানের প্রথম মহিলা প্রধান হিসেবে নির্বাচিত হন। ২০০৪ সালে গ্লোবাল স্ট্রাটেজিক কমিটির সদস্য হন।

তিনি ফরাসী রাজনৈতিক শ্রেণীর একমাত্র সদস্য ছিলেন যিনি জিন পাল গারলাইন্স এর বর্ণবাদী মন্তব্যের নিন্দা জানান। বুঝতেই পারছেন তিনি বহুমুখী কর্মশক্তিসম্পন্ন একজন ক্ষমতাধর নারী যার স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে ২০১৪ সালে ফোর্বস ম্যাগাজিন কর্তৃক বিশ্বের ৫ম ক্ষমতাধর নারী হিসেবে সম্মানিত করা হয়।

নিশ্চয়ই জানতে ইচ্ছে হচ্ছে এই ক্ষমতাধর নারীর পারিবারিক অবস্থা কেমন ছিল তবে! হয়তো এর মধ্যে ভাবতে শুরু করছেন তিনি কী কোনো হতদরিদ্র বাবা-মায়ের সন্তান ছিলেন নাকি কোনো রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম হয়েছিল নাকি কোনো ক্ষমতাধর বাবা-মায়ের উত্তরসূরি!  না, এর কোনটাই ঠিক নয়। তাঁর জন্ম হয়েছে ১ জানুয়ারি ১৯৫৬ সালে ফ্রান্সের প্যারিস শহরে। বাবা-মা দুজনই শিক্ষাবিদ ও গবেষক। বাবা রবার্ট ছিলেন ইংরেজি সাহিত্যের শিক্ষক এবং মা নিকলে ছিলেন ল্যাটিন, গ্রিক ও ফরাসী সাহিত্যের শিক্ষক। লেগার্ডে নিজেও ইংরেজি, শ্রম আইন ও সামাজিক আইন বিষয়ে প্যারিস ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি নানটারে লা ডিফেন্স  থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জন করেন। তাঁর বয়স যখন ১৭ বছর তখন তাঁর বাবা মোটর নিউরন রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। লেগার্ডে বাবা-মায়ের বড় সন্তান এবং তাঁর ছোট আরও তিন ভাই রয়েছে। ব্যাক্তি জীবনে লেগার্ডে দুই পুত্র সন্তানের জননী। বর্তমানে তিনি স্বামীর সাথে বিবাহবিচ্ছেদ করেছেন।

“তিনি বহুমুখী কর্মশক্তিসম্পন্ন একজন ক্ষমতাধর নারী যার স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে ২০১৪ সালে ফোর্বস ম্যাগাজিন কর্তৃক বিশ্বের ৫ম ক্ষমতাধর নারী হিসেবে সম্মানিত করা হয়”

কথায় আছে, খ্যাতির বিড়ম্বনাও নাকি সইতে হয়। আর সেই অর্থে লেগার্ডের আকাশচুম্বী খ্যাতির পিছনে কিছুটা বিড়ম্বনা থাকাটা অস্বাভাবিক কিছু না, আবার অস্বাভাবিকও বটে। কেননা আইএমএফ এর মতো প্রতিষ্ঠানের প্রথম নারী ব্যাবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পাওয়াটা কারো কারো কাছে নিতান্তই প্রহসনমূলক নিয়োগ মনে হয়েছে। হাঁ, উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে কাজ করে যাওয়া একটি প্রধান দাতব্য সংস্থা অক্সফাম লেগার্ডের নিয়োগকে সম্পূর্ণ প্রহসনমূলক নিয়োগ প্রক্রিয়া ও স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে বলে মন্তব্য করেন। অক্সফামের এমন মন্তব্য ক্রিস্টিন লেগার্ডে তথা আইএমএফ এর বিশ্বাসযোগ্যতার উপর বড় ধরণের আঘাত হিসেবে দেখা হয়েছে।

তবে সেইসব বিড়ম্বনা ও নিন্দা উপেক্ষা করে ফরাসী অর্থনীতিবিদ মাইকেল সোইন বলেন- ‘দুষ্কৃতকারী দ্বারা যতই অবজ্ঞার শিকার হোক না কেন লেগার্ডে আইএমএফ এর প্রধান হিসেবে থাকবে।’ অন্যদিকে ইউএস সেক্রেটারি টিমোথি গেইথনার বলেন- ‘লেগার্ডের ব্যতিক্রমী প্রতিভা এবং বিস্তৃত অভিজ্ঞতা বিশ্ব অর্থনীতির নাজুক অবস্থায় একটি উল্লেখযোগ্য নেতৃত্ব প্রদান করবে আইএমএফ এর মতো প্রতিষ্ঠানের জন্য।’ তাছাড়া, নিকোলাস সারকোজি লেগার্ডের নিয়োগকে ফ্রান্সের জন্য এক অভূতপূর্ব বিজয় বলে উল্লেখ করেছেন।

Lagarde-IMF-Morocco1-1024x546স্বাস্থ্য সচেতন লেগার্ডে নিরামিষভোজী। তাঁর শখ হচ্ছে নিয়মিত ভ্রমণ করা। তাছাড়া সুসাস্থের জন্য তিনি নিয়মিত শরীরচর্চা, সাইক্লিং এবং সাঁতার কাটেন। তিনি নিজের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে কখনো অনুতপ্তও হন না। ইউএন সেক্রেটারি ম্যাডেলেইন আলব্রাইট এর একটি কথা খুব পছন্দ করেন- ‘সেইসব নারীদের জন্য নরকে বিশেষ একটি জায়গা আছে যারা অন্য নারীকে সাহায্য করেনা।’ তাছাড়া এলিনর রুজভেল্টের বিখ্যাত একটি উক্তি ও তাঁর খুব পছন্দ। সেটা হল-‘নারীরা  টি বা চা ব্যাগের মতো, আপনি যখন গরম জলের মধ্যে তাদের রাখবেন তখন দেখবেন তারা কতো শক্তিশালি।’ সম্প্রতি তিনি ফ্রান্সের একটি পত্রিকায় বলেন- সাফল্য কখনো সম্পূর্ণ হয় না, এটা এক সীমাহীন সংগ্রাম।

তথসূত্র: উইকিপিডিয়া,  টুইটার, দ্যা গার্ডিয়ান, ফোর্বোস, আইএমএফ ওয়েবসাইট এবং ফ্রান্স ২৪favicon594

Sharing is caring!

Leave a Comment