প্রযুক্তির আঙিনায় উদ্ভাবনী নারী

প্রযুক্তির আঙিনায় উদ্ভাবনী নারী

  • লিডারশিপ ডেস্ক
নারীর জীবন কি শুধু রান্না ঘরেই আটকে থাকবে? সারা জীবন শুধু সংসারের ঘানি টানাই কি তার একমাত্র কাজ? না। সমাজ ও জীবন ধারায় নারীর অবস্থান বদলে যাচ্ছে। প্রযুক্তি-দক্ষতা নারীর জন্য অপার সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। ডিজিটাল জগতে সক্ষমতা বৃদ্ধি ও উদ্ভাবনী শক্তি নারীকে সমাজ ও অর্থনীতিতে দিচ্ছে মর্যাদার আসন।

যে কোনো দেশের তরুণ-তরুণীরা নব নব আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে তাদের দেশকে বহুদূর এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। একটি দেশের অর্ধেক নারী। জনগোষ্ঠীর এই অর্ধেক অংশকে অন্ধকারে ফেলে কোনো দেশের পক্ষে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তাই নব নব প্রযুক্তির উদ্ভাবনে নারী-পুরুষ দু’পক্ষেরই অংশগ্রহণ প্রয়োজন। এদেশের তরুণ তরুণীদের নতুন প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনে উত্সাহিত করতে ব্র্যাকের উদ্যোগে ও ভারতের ডিজিটাল এমপাওয়ারমেন্ট ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় সম্প্রতি আয়োজন করা হয় ‘ব্র্যাক মন্থন ডিজিটাল ইনোভেশন অ্যাওয়ার্ড’। এখানে মোট ১১৩ জন আবেদন করেন, যার মধ্যে ২৯ জনকে চূড়ান্তভাবে মনোনীত করা হয়। এদের মাঝে ওম্যান ইন ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রজেক্টের মধ্যে দিয়ে ই-ওম্যান, ইনক্লুশন অ্যান্ড এমপাওয়ারমেন্ট ক্যাটাগরিতে পুরস্কার জেতেন আছিয়া খালেদা নীলা। 1477231926-1

তার প্রজেক্টের লক্ষ্য, এ ধরনের কাজের অনুপ্রেরণা এবং বাংলাদেশে তার প্রয়োগ সম্পর্কে জানতে আলোচনা হচ্ছিল। তিনি বলেন, দেশকে এগিয়ে যেতে হলে নব প্রযুক্তিকে আপন করে নিতে হবে, নতুন নতুন কাজের মধ্য দিয়ে আমাদের জনশক্তিকে কাজে লাগাতে হবে। আমি কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে অনার্স-মাস্টার্স সম্পন্ন করেছি। পড়াশোনা শেষে প্রায় নয় বছরের মতো সফটওয়্যার কোম্পানিতে কাজ করি। তবে আমি আমার কাজ নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলাম না।   আমার সব সময় নতুন কিছু করার ইচ্ছা ছিল। যা আমাদের নারীদের সাথে সাথে দেশকেও এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করবে। ২০১৩ সালে আমাদের ওম্যান ইন ডিজিটাল বাংলাদেশের যাত্রা শুরু, এটি মূলত একটি সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজ।

নারীদের ডিজিটাল প্রযুক্তির সঙ্গে সম্পৃক্ত করার মধ্য দিয়ে তাদের জীবনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই আমাদের লক্ষ্য। নানা ব্যবসার মধ্য দিয়ে তাদের আয়ের পথ খুলে দেওয়াও আমাদের আরেকটি লক্ষ্য। প্রথমে নানা ধরনের সফটওয়্যার তৈরি করে আউটসোর্সিংয়ের মধ্য দিয়ে আমাদের যাত্রা শুরু। এখন আমার সাথে ১৫ জন নারী প্রোগ্রামার কাজ করছে। আমরা মূলত মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনস, গেমস নিয়ে কাজ করছি। আউটসোর্সিংয়ের মধ্য দিয়ে আমাদের মাসিক আয় প্রায় ৪০০০ থেকে ৪৫০০ ডলার।

আমাদের দেশে এখনো অনেক নারী পাস করে চাকরির জন্য বসে থাকে। যা দেশের জন্য ক্ষতিকর, আবার একই সঙ্গে ব্যক্তি হিসেবে নিজের জন্যও ক্ষতিকর। বেকারত্বের যাতনা নারীকে মানসিকভাবে ভেঙে দেয়। সঠিক প্রযুক্তিগতবিদ্যা অর্জন করে ঘরে বসে আউটসোর্সিংয়ের মধ্য দিয়ে অনেক উপার্জন সম্ভব। শুধু সঠিক জ্ঞানের অভাবে তারা সে সুযোগ কাজে লাগাতে পারছে না। এজন্য আমরা বিভিন্ন জেলায় নারীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছি।

আমরা কম্পিউটার, নেটওয়ার্কিং, হ্যান্ডিক্রাফট, ফ্যাশনের ওপর ট্রেনিং দেই। ময়মনসিংহে ট্রেনিং দেওয়ায় কয়েকজন নারী এখন ডাটা এন্ট্রি ও এসিইউয়ের মাধ্যমে ঘরে বসে উপার্জন করছে। দেশের মধ্যে আউটসোর্সিংয়ের পেমেন্ট তুলনামূলক অনিশ্চিত, তাই আমাদের আউটসোর্সিং বেশিরভাগ বিদেশে। নারীদের ই-কমার্সের সাথে যুক্ত করার লক্ষ্যে আমরা গ্রামে গ্রামে নারীদের প্রস্তুত করে নানা প্রোডাক্ট মার্কেটিং করছি।

অনলাইনে তারা তাদের প্রোডাক্ট বিক্রি করতে পারছে। এ ছাড়া বিভিন্ন স্থানে তাদের নানা প্রডাক্টের প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করছি। এখন পর্যন্ত ১৭টি জেলায় আমাদের শাখা আছে। যেখানে নানা ধরনের ওয়েবসাইট, মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন, ডাটা এন্ট্রিসহ তাদের কম্পিউটার ব্যবহারের ট্রেনিং দেওয়া হচ্ছে। যেন পরবর্তীকালে প্রযুক্তিগত বিদ্যা ব্যবহারের মধ্য দিয়ে তারা উপার্জন করতে পারে।

এছাড়াও আমরা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং করে থাকি। কী ধরনের কাজ কার জন্য উপযোগী, কী করলে তা তার ক্যারিয়ারে এগিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করবে, সেখানে এসব আলোচনা করা হয়ে থাকে। ব্র্যাক মন্থন অ্যাওয়ার্ডের মধ্য দিয়ে আমি আরো সামনে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা পাচ্ছি। এর আগে ২০১৪ সালে দিল্লি থেকে মন্থন অ্যাওয়ার্ড পাই। যখন আমাদের দেশে এ অ্যাওয়ার্ডের খবর দেখি তখন আমি আমার প্রজেক্ট নিয়ে আবেদন করি। আমি মনে করি আমাদের দেশে এ ধরনের আরো প্রতিযোগিতার আয়োজন করা উচিত। যা তরুণ-তরুণীদের নতুন চিন্তা করতে, নব নব উদ্ভাবন করতে অনুপ্রাণিত করবে।
এই লেখাটি দৈনিক ইত্তেফাকের সৌজন্যে প্রকাশিত
favicon59-4

Sharing is caring!

Leave a Comment