ফরহাদ কেন গুগল ছাড়লেন?

ফরহাদ কেন গুগল ছাড়লেন?

  • লিডারশিপ ডেস্ক

প্রকৌশলবিদ্যা কিংবা বিজ্ঞানের ছাত্রছাত্রীদের জন্য গুগলে চাকরি পাওয়াটা স্বপ্নের মতো। ফরহাদ আহমেদ গুগলে ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন। বড় স্বপ্নের জন্য ফরহাদ গুগল ছেড়েছেন। দেশে ফিরে প্রতিষ্ঠা করেছেন নিজের প্রতিষ্ঠান—অ্যালগোমেট্রিকস।

সংগ্রামী জীবন

ফরহাদের বেড়ে ওঠা সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার ভাদেশ্বর এলাকার পূর্বভাগ গ্রামে। দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় বাবা আবু তাহের পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়েন। পড়াশোনা করাই দুষ্কর হয়ে পড়েছিল। উচ্চমাধ্যমিক পাস করে ২০০৭-০৮ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল (সিএসই) বিভাগে। ঘরে অসুস্থ বাবা, উপার্জনক্ষম কেউ নেই। পড়াশোনা আর চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়—এমন পরিস্থিতিতে ফরহাদের পাশে দাঁড়ান তাহেরা সিরাজ নামে দূরসম্পর্কের এক দাদি। ভালো ছাত্র হিসেবে এলাকায় পরিচিতি ছিল। সেই সুবাদে আগে থেকেই সহযোগিতা করতেন তিনি। তবে সিএসই বিভাগে ভর্তির পর পড়াশোনার খরচের পুরো দায়িত্ব নিয়ে নেন ওই দাদি। কৃতজ্ঞ ফরহাদের ভাষায়, ‘উনি আমার রক্তের সম্পর্কের কেউ না হলেও আমার জন্য যা করেছেন, তার জন্য আমি চিরকৃতজ্ঞ।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষেই প্রোগ্রামিং বিষয়টি ভালো লেগে যায়। অংশ নেন আন্তবিশ্ববিদ্যালয় প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতাগুলোয়। ফরহাদ ও তাঁর দুই সহপাঠীর দল সাস্ট-পেলিনড্রোম ২০১২ সালে এসিএম-আইসিপিসির বাংলাদেশ পর্বে রানারআপ হয়ে প্রোগ্রামিংয়ের বিশ্ব আসরে অংশ নেন পোল্যান্ডে। পরের বছরও রাশিয়ায় অনুষ্ঠিত এসিএম-আইসিপিসির ওয়ার্ল্ড ফাইনালে অংশ নেন তাঁরা। ২০১২ সালে সিএসই বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন ফরহাদ। বাংলা ভাষার প্রথম সার্চ ইঞ্জিন পিপীলিকায় গবেষক ও ডেভেলপার হিসেবে যোগ দেন।

গুগলে যোগ ও বিয়োগ

ফরহাদ দুবার প্রোগ্রামিংয়ের ওয়ার্ল্ড ফাইনালে অংশ নিয়েছেন, বিষয়টি তত দিনে অনেকে জেনে গেছে। এই জানাশোনাটাই কাজে লাগল। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বড় ভাই গুগলে কাজ করতেন, তিনিই ফরহাদকে নেওয়ার ব্যাপারে গুগলের সঙ্গে আলোচনা করলেন। সিভি জমা দেওয়া হলো। সাক্ষাৎকারের জন্য ডাকল গুগল। প্রথমে ফোনে, পরে সরাসরি সাক্ষাৎকার দিলেন। গুগলের যুক্তরাষ্ট্র কার্যালয়ে নিয়োগ দেওয়ার জন্য নির্বাচিত হলেন তিনি। কিন্তু এইচওয়ানভি ভিসা লটারিতে বাদ পড়লেন। পরে গুগল থেকে ফরহাদকে আয়ারল্যান্ড বা লন্ডন অফিসে যোগ দিতে বলা হয়। ফরহাদ লন্ডন কার্যালয়টিই বেছে নেন। ২০১৬ সালের মার্চে যোগ দেন গুগলের লন্ডন কার্যালয়ে। ও হ্যাঁ, এর আগে ফেসবুকেও তাঁর চাকরি চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছিল।

গুগলের বিভিন্ন সেবা দেওয়াকে সব সময় সচল (লাইভ) রাখার কাজ করত একটি দল। সেই দলে কাজ করতেন তিনি। বিষয়টি তাঁকে খুব টানত। গুগল কীভাবে কোটি কোটি ব্যবহারকারীকে নিরবচ্ছিন্ন সেবা দেয়—কৌতূহল নিয়ে খুব কাছ থেকে দেখলেন ফরহাদ। বেশির ভাগই রক্ষণাবেক্ষণের কাজ। নতুন ধারণা নিয়ে কাজ করার সুযোগ হচ্ছিল না। ফরহাদ বুঝতে পারছিলেন, তিনি আরও বড় কিছু করতে চান। বলছিলেন, ‘গুগলে কাজ করলেও সব সময় আমার স্বপ্ন—নিজের প্রতিষ্ঠান গড়ার বিষয়টি মাথায় ছিল। তা ছাড়া বাংলাদেশে স্টার্টআপের জন্য এখন খুব ভালো সময়। এই সময়টা কাজে লাগানো উচিত বলে আমার মনে হয়েছিল। স্ত্রী রিপা বেগম খানের সঙ্গে আলোচনা করলাম। কাছের বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা করলাম। লন্ডনে বাংলাদেশি কমিউনিটির কয়েকজনের সঙ্গে কথা বললাম। এরপর সিদ্ধান্ত নিলাম, গুগল ছেড়ে দিয়ে আমি নিজের প্রতিষ্ঠান গড়ব।’

নিজের উদ্যোগ

২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ফরহাদ আহমেদ দাঁড় করান তাঁর নিজের তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান—অ্যালগোমেট্রিকস। তাঁদের প্রথম পণ্য হলো ডাংগুলি (www.dungulie.com)। ডাংগুলিকে বলা হয় একটি ‘রিকোমেন্ডার সিস্টেম’। সংবাদমাধ্যমগুলোর নানা খবর, ভিডিও ব্লগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারকাদের খবর…ব্যবহারকারীদের পছন্দ অনুযায়ী সব উপস্থাপিত হবে তাঁদের সামনে। আজ রোববার আরও একটি পণ্য বাজারে আনছে অ্যালগোমেট্রিকস, যার নাম হারিআপ। বিভিন্ন দোকানের সেবা দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে কাজ করবে হারিআপ। সিলেট শহরের নাইওরপুল এলাকায় অ্যালগোমেট্রিকসের কার্যালয়। কাজ করেন ১০ থেকে ১২ জন। সশরীরে সবাইকে অফিসে কাজ করতে হয় না। বেশির ভাগ সময় অনলাইনে মিটিং সেরে তাঁরা কাজ জমা দিয়ে দেন। পরিসর বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে। আরও নতুন কয়েকটি সেবা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে চান ফরহাদ।

গুগলে এক বছরের বেশি চাকরি করার পর, ঝুঁকি নিয়ে কেন দেশে নিজের প্রতিষ্ঠান শুরু করলেন? ফরহাদ আহমেদের বিনয়ের সঙ্গে উত্তর দিলেন, ‘এ দেশের খেটে খাওয়া মানুষের করের টাকায় পড়াশোনা করেছি। সব সময় মাথায় ছিল, দেশের জন্য কিছু একটা করব। তা ছাড়া নিজের প্রতিষ্ঠান গড়ে আমি আমার স্বপ্ন পূরণ করতে চেয়েছি।’

সূত্র : প্রথম আলো

Sharing is caring!

Leave a Comment